জ্ঞান ফিরেছে ইউএনও ওয়াহিদার

জ্ঞান ফিরেছে ইউএনও ওয়াহিদার

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউতে তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন চিকিৎসকরা।

শুক্রবার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের উপপরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম জানান, অস্ত্রোপচারের পর রাতেই জ্ঞান ফিরেছে ইউএনও ওয়াহিদার। তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর্যায়ে এখনও আসেনি। তাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শনিবার মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে রাত সাড়ে ৯টা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত চলে ওয়াহিদার অপারেশন। অস্ত্রোপচার শেষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল হক জানান, অস্ত্রোপচার সফল হলেও এখনও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নন ওয়াহিদা খানম। তাকে ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ওয়াহিদা খানমের আড়াই ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারে অংশ নেন ছয়জন চিকিৎসক। সঙ্গে ছিলেন একজন অবেদনবিদ।

এর আগে বৃহস্পতিবার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ওয়াহিদা খানমের শরীরের ডান অংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল হক সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, ইউএনওর মাথার খুলির হাড় ভেঙে মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে। তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। শরীরের ডান অংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে।

এদিকে ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর গভীর রাতে হামলার ঘটনায় দু’জনকে শুক্রবার ভোরে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার দুজন হলেন- আসাদুল ইসলাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীর আলম (৪২)।

জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলম ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। ২০১৭ সালে কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে তিনি আহ্বায়ক হন। আর আসাদুল ইসলাম আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে।

ওসি ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাকিমপুর, বিরামপুর ও ঘোড়াঘাট থানা এবং র‌্যাব রংপুর-১৩ এর একটি দল যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার ভোর ৪টা ৫০মিনিটের দিকে হিলির কালিগঞ্জ এলাকা থেকে আসাদুল ইসলাম (৩৫) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে। আসাদুল ইসলাম ঘোড়াঘাট উপজেলার সাগরপুর গ্রামের এমদাদুল হকের ছেলে।

এছাড়া জাহাঙ্গীর (৪২) নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বাড়ি ঘোড়াঘাটের রাণীগঞ্জ এলাকায় বলে জানান ওসি।

ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিরুল ইসলাম জানান, ওয়াহিদা খানমের ও তার বাবার ওপর হামলার ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘোড়াঘাট থানায় এজাহার দায়ের করেছেন ইউএনওর ভাই মো. শেখ ফরিদ উদ্দিন। এজাহারে অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামি করেন তিনি।

বুধবার দিবাগত ৩টার দিকে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলার অভিযানে অংশ নেয় দু’জন। তবে হামলাকারীরা কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তারা হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঘোড়াঘাট ইউএনওর বাসভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, হামলায় অংশ নেয়া দুজনের মধ্যে একজন ছিল মুখোশ ও অন্যজন পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পরা। রাতে তারা এক এক করে বাড়িতে প্রবেশ করে এবং ঘটনার পর একই সঙ্গে বের হয়ে যায়।

ভৌগলিক অবস্থানের দিক দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ক্যাম্পাস ও ঘোড়াঘাট থানার দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার হওয়ায় দুস্কৃতকারীরা নির্বিঘ্নে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে বৃহস্পতিবার রাতে এমন কথা নিশ্চিত করেন, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার ওয়াদুদ ভুইয়া ও পুলিশের রংপুর জোনের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য।

উল্লেখ্য, বুধবার দিবাগত রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবাকে নিজের সরকারি বাসভবনে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে গুরুতর অবস্থায় রংপুর মেডিকেল হাসপাতাল থেকে বেলা ১২টা ৪৭ মিনিটে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে একটি হেলিকপ্টার ওয়াহিদা খানমকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

আহত নির্বাহী কর্মকতার নাম ওয়াহিদা খানমের বাবার নাম ওমর আলী। নওগাঁ থেকে মাঝে মাঝে মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা। ওয়াহিদা খানমের স্বামী রংপুরের পীরগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।

ঘোড়াঘাট থানা পুলিশের ওসি আমিরুল ইসলাম জানান, ঠিক কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের স্বামী রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।

ত্রিমুখী আক্রোশের শিকার ইউএনও!
দিনাজপুর ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম ত্রিমুখী আক্রোশের শিকার হতে পারেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলার প্রধান নির্বাহী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপস করেননি। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করাই তার কাল হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র মতে, ঘোড়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন রুট সীমান্তবর্তী ও স্থলবন্দর হিলির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় মাদকের একটি নিরাপদ স্থল হিসেবে ঘোড়াঘাট উপজেলার রাস্তাঘাট ব্যবহার হতো। সেই ঘোড়াঘাটের মাদক ব্যবসায়ীরা এই ইউএনওর কারণে মাদকের বর্তমানে ব্যবসা সুবিধা করতে না পারার ক্ষোভ রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের।

অন্যদিকে করোনাকালে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির ত্রাণ আত্মসাতের ঘটনায় বিভিন্ন গোডাউনে অভিযান চালিয়ে সেই সরকারি ত্রাণ উদ্ধার করা এবং সেই সব জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা, জনপ্রতিনিধির ক্ষোভ আর বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অন্যায় আবদার ও সরকারি সম্পদ বিলিয়ে না দেয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের একাংশের ক্ষোভ ছিল ইউএনওর ওপর। এই ত্রিমুখী ক্ষোভে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা একত্র হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াহিদা খানমকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

Comments are closed.